প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ২৩:৪৯ (বুধবার)
এস আলমের মামলা লড়তে ব্রিটিশ ল ফার্ম নিয়োগ, ঘণ্টায় ব্যয় ১২৫০ ডলার

আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলম (এস আলম) ও তার পরিবারের করা মামলার বিরুদ্ধে লড়তে ব্রিটিশ একটি ল ফার্ম নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এই আইনি লড়াইয়ে সংশ্লিষ্ট ল ফার্মকে ঘণ্টায় ১ হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার ফি দিতে হবে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে ল ফার্মা নিয়োগ ও অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে দায়ের করা আরবিট্রেশন মামলা নং-আেইসিএসআইডি (কেস নম্বর-এআরবি/২৫/৫২) পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক ল ফার্ম নিয়োগ ও আইনি সেবা ক্রয়ের একটি প্রস্তাব নিয়ে আসে বৈঠকে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। 

সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে ব্রিটিশ ল ফার্ম ‘হোয়াইট অ্যান্ড কেইস এলএলপি’-কে নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। ল ফার্মটি থেকে সেবা নেওয়ার জন্য ঘণ্টায় ১ হাজার ২৫০ ডলার দিতে হবে। 

এ বিষয়ে বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা জানেন অর্থ পাচারের ব্যাপারে এস আলম বোধহয় একটা কেস করেছে লন্ডনে এবং চ্যালেঞ্জ করেছে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটলমেন্ট অফ ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটসে (আইসিএসআইডি)। ওদের লিগাল ফাইট করার জন্য আমরা একজন লিগাল লয়ার-কে এঙ্গেজ করব। কারণ এটা বহু টাকার ব্যাপার। এটা ওরা আবার ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মত অর্গানাইজেশন অভিযোগ করেছে।’

কোন দেশের এবং কোন প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে? সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের উত্তরে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নামটা আমার এই মুহুর্তে মনে নেই, এটা একটা ব্রিটিশ ফার্ম।’

সাংবাদিকদের অপার এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘অর্থ পাচারের ব্যাপারে এস আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আপনারা জানেন কোনো দেশের সরকার বা কোম্পানি ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দিলে ওয়াল্ড ব্যাংকের আইসিএসআইডি আরবিট্রেশন করে। আরবিট্রেশন আমাদেরকে নোটিশ দিয়েছে। আরবিট্রেশন জবাব দিতে হবে আমাদেরকে এবং এটা খুব কমপ্লিকেটেড, সহজ তো না।’

গত বছরের অক্টোবরে ওয়াশিংটনে অবস্থিত আইসিএসআইডিতে এস আলম ও তার পরিবারের আইনজীবীরা আনুষ্ঠানিকভাবে সালিশি মামলার আবেদন জমা দেন। আবেদনে অভিযোগ করা হয়, অবৈধ অর্থ পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার যে সম্পদ জব্দ, বাজেয়াপ্ত ও অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, তাতে তাদের শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

সালিশি আবেদনে এস আলম পরিবার দাবি করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের লক্ষ্য করে ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদ বাজেয়াপ্ত, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ‘ভিত্তিহীন’ তদন্ত এবং ‘প্ররোচনামূলক মিডিয়া অভিযান’ পরিচালনা করছে। এসব পদক্ষেপকে তারা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তির পরিপন্থি বলে উল্লেখ করেছে।

এস আলম ও তার পরিবার সালিশি মামলা করেছে ২০০৪ সালের বাংলাদেশ–সিঙ্গাপুর দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির আওতায়। নথি অনুযায়ী, এস আলম পরিবার ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে এবং ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে তারা সিঙ্গাপুরে বসবাস করছে।

এস আলম পরিবার দাবি করেছে, সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে তারা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে। একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশের ১৯৮০ সালের বিদেশি ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আইনের অধীনেও সুরক্ষা দাবি করছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এরপর থেকেই বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের অভিযোগে একাধিক শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তদন্ত এবং সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নেয় সরকার।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর প্রকাশিত অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে এই পাচারের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়। পাচার অর্থ উদ্ধারে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর অভিযোগ করেন, প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে এস আলম পরিবার।

তিনি বলেন, এস আলম ও তার সহযোগীরা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় জোরপূর্বক একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ঋণ ও আমদানি জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেয়। ছয়টি ব্যাংকের করুণ অবস্থার কারণে সরকারকে বেইলআউট দিতে হয়েছে। 

তবে এস আলম গ্রুপ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে সরকার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে পারেনি।